
বিশেষ প্রতিবেদন:
অফিসার আসেন, দায়িত্ব পালন করেন, আবার চলেও যান—এটি সরকারি চাকরির সাধারণ নিয়ম।” কিন্তু কিছু কর্মকর্তা নিজ কর্মনিষ্ঠা, সাহসিকতা ও অকৃত্রিম মানবিকতা দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে জায়গা করে নেন, যাদের বিদায় সহজভাবে মেনে নেওয়া যায় না। সাভারের বিরুলিয়া ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) আল-আমিনের হঠাৎ বদলির খবরে ঠিক এমনই এক গভীর হতাশা, বিষাদ ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিরুলিয়া ইউনিয়ন জুড়ে।
আস্থা ও ভরসার মাত্র ৯ মাস ২০ দিন
মাত্র ৯ মাস ২০ দিন আগে পঞ্চগড় জেলার সুসন্তান, বাংলাদেশ পুলিশের কর্মঠ এসআই আল-আমিন বিরুলিয়া ফাঁড়ির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং স্থানীয়দের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। বিরুলিয়ার ২৯টি গ্রামের আনাচে-কানাচে দিন-রাত ছুটে চলা, অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান এবং সংকটে পড়া সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বিরুলিয়াবাসীর নিকট এক অনন্য আস্থা ও ভরসার প্রতীকে পরিণত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বিদায়ী পোস্টে এসআই আল-আমিন নিজেই লিখেছেন, “বিরুলিয়াতে কর্মজীবনে আমার কখনো মনে হয়নি যে আমি অন্য কোথাও থেকে এসেছি, মনে হয়েছে আমিও এই ইউনিয়নেরই একজন!”
বিদায়বেলায় তিনি স্মৃতিচারণ করে উল্লেখ করেন, এলাকার ২৯টি গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের সেবা করা, ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানে পাশে থাকা এবং বিশেষ করে বহু আলোচিত ‘কৃষিবিদ ও কমলাপুর সড়ক’-এর ডাকাতি ও ছিনতাই চিরতরে বন্ধ করতে পারাটা তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। এছাড়া ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি মসজিদে নামাজ আদায় করা এবং স্থানীয় ইমামদের সুরেল তিলাওয়াতের স্মৃতি সারাজীবন হৃদয়ে আগলে রাখবেন জানিয়ে তিনি বিরুলিয়াবাসীর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
অপরাধীদের জন্য আতঙ্ক, সাধারণের পরম আশ্রয়
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দীর্ঘ বছর ধরে তারা বিরুলিয়া ইউনিয়নে এসআই আল-আমিনের মতো এমন পেশাদার ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা দেখেননি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি মাদক, চুরি, ছিনতাই এবং নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর গৃহীত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ফলে বিরুলিয়ায় বহু বছর পর শান্তিময় পরিবেশ ফিরে এসেছিল।
তবে এই জনপ্রিয় কর্মকর্তার হঠাৎ বদলির খবরে বিরুলিয়ার সাধারণ মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মনে জমেছে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক। স্থানীয়দের আশঙ্কা—যে অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ী চক্র এত দিন আল-আমিনের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল, তিনি চলে যাওয়ায় তারা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট বক্তব্য, “এমন দক্ষ ও মানবিক অফিসার ইনচার্জের হঠাৎ বদলি বিরুলিয়ার ভবিষ্যৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য কোনো ভালো সংকেত নয়।” নতুন নেতৃত্বের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এসআই আল-আমিনের রেখে যাওয়া সাফল্যের স্থান পূরণ করা নতুন ইনচার্জের জন্য হবে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
বিরুলিয়ার অর্জিত শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ ধরে রাখতে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন এবং সাভার থানা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আহ্বান—বিরুলিয়াকে পুনরায় অপরাধের অভয়ারণ্য হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং অপরাধীদের দমনে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও এসআই আল-আমিনের মতোই মাদকের বিরুদ্ধে আপসহীন ও জনবান্ধব নীতি বজায় রেখে কাজ করতে হবে।
এক আল-আমিন হয়তো তাঁর সরকারি কর্তব্যের টানে নতুন কোনো কর্মস্থলে যোগ দেবেন, কিন্তু বিরুলিয়াবাসীর হৃদয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার যে বীজ তিনি বুনে গেছেন, তা থেকে যাবে দীর্ঘদিন। বিদায়, বিরুলিয়ার বীর!